ডিএনডির ২২ লাখ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে

ডিএনডি (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা) এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১০ সালে সরকার ২৩৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। পরে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট একনেকের সভায় ৫৫৮ কোটি টাকার ডিএনডির এক মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে পানি নিষ্কাশনের খাল পুনর্খননের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন। ২০১৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সেনাবাহিনী চুক্তিবদ্ধ হয়। প্রকল্পের কাজ চলতি বছর জুনে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের কারণে দেড় মাস বন্ধ ছিল এই প্রকল্পের কাজ। এ ছাড়াও প্রকল্পে নতুন করে অর্থ অনুমোদনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। যা ইতোমধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় অনুমোদনে সম্মতি প্রদান করেছে। এখন ডিএনডির অভ্যন্তরের ২২ লাখ মানুষ তাকিয়ে আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে।

আগামী ১ সেপ্টেম্বর একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিএনডি প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের (আরডিপিপি) বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এটি অনুমোদন হলে প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত শেষ করা যাবে। ডিএনডি প্রকল্পে সরকার যে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ছিল সেই টাকায় প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ করা গেছে। বাকি কাজ করতে গেলে নতুন করে আরও ৭৩২ কোটি টাকা প্রয়োজন। ১ সেপ্টেম্বরের একনেক সভায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যেন বিশেষ নজর দেন, সে অপেক্ষায় ডিএনডিবাসী।

ডিএনডি প্রকল্পের কাজ করছে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীন ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিএনডি প্রকল্প এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ওয়াসা, বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার সার্ভিস লাইন রয়েছে। এগুলো সঠিক কোনো প্ল্যানে করা হয়নি। এ ছাড়াও মানুষের বাড়িঘরের বর্জ্যরে জন্য কোনো স্যুয়ারেজ লাইন নেই। ফলে কাজ করতে গেলেই বিভিন্ন জায়গায় সংকট তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধ স্থাপনা এবং মানুষের অসচেতনতা তো রয়েছেই। এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির কাজ আমরা এমনভাবে করতে চাই, যে রকম সেনাবাহিনীর কাছে মানুষ প্রত্যাশা করে। কাজটি যাতে দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে সুফল দেয় এবং টেকসই হয়, সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। পুরো ডিএনডি এলাকাটি যাতে দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন এবং আগামী কয়েক যুগে যেন এই এলাকায় কোনো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সেনাবাহিনী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে ৫৮ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নির্মাণকাজ করা ডিএনডি প্রকল্পটি ২০২০ সালে এসে একটি অপরিকল্পিত এবং অব্যবস্থাপনার নগরীতে পরিণত হয়েছে। ফলে সেনাবাহিনীকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরিকল্পনামাফিক প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, খাল, জমি ও রাস্তা পুনরুদ্ধার করতে হচ্ছে। একই খাল কয়েক দফা পরিষ্কার করতে হচ্ছে। কারণ অসচেতন মানুষ প্রতিনিয়ত খালেই ময়লা-আবর্জনা ফেলছে। ফলে পরিকল্পনামাফিক কাজ বাস্তবায়ন করতে খরচও বেড়ে গেছে অনেক।

গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান সিদ্ধিরগঞ্জের এক অনুষ্ঠানে বলেন, আমি কৃতজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী তার অনুরোধে ডিএনডি প্রজেক্ট টেবিল এজেন্ডা হিসেবে তুলে অনুমোদন করেছেন। প্রথম দিকে এটা কোনো প্ল্যানে ছিল না। এখন এটাকে প্ল্যানে নিয়ে আসা হয়েছে। এই প্রকল্পটি যেন আগামী পঞ্চাশ বছর মানুষকে উপকার দিতে পারে সে জন্য আরও টাকা দরকার। এবং টাকার অঙ্কটা কম নয়। সাতশ কোটি টাকার ওপরে দরকার প্রকল্পটি শেষ করতে। এই প্রকল্পটি করতে সর্বমোট প্রায় ১৩শ কোটি টাকা প্রয়োজন। যার মধ্যে ৫৫৮ কোটি টাকা আগেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা দিয়ে এখন পর্যন্ত কাজ করা হয়েছে। আমি আমার চেষ্টার ত্রুটি করছি না। আপনারা সকলে দোয়া করলে প্রকল্পের বাকি যেই অর্থের প্রয়োজন, তা আমরা পেয়ে যাব এবং প্রকল্পের কাজও আমরা খুব দ্রুত শেষ করব।

সরেজমিন ডিএনডির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রবল বর্ষণে এখনো পানি আটকায়। তবে সেটা দ্রুত নেমে যায়। তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনো বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে। যতদিন ডিএনডি প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হবে, ততদিন এসব এলাকার জলাবদ্ধতা পুরোপুরি শেষ হবে না বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত এই প্রকল্পের কাজটি যাতে পরিপূর্ণ করেই শেষ করা হয়। তা হলেই ডিএনডি অভ্যন্তরের মানুষগুলো পানিবন্দি থেকে চিরস্থায়ী মুক্তি পাবে। এই এলাকার ২২ লাখ মানুষ এখন প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে আছে। তারা মনে করেন প্রধানমন্ত্রীই তাদের এই সমস্যা থেকে উত্তরণ করতে পারবেন।