খেলা নেই : চাকরি হারানোর শঙ্কায় বিজেএমসির নারী ফুটবলাররা

জাতীয় দলের সহকারী কোচ মাহমুদা আক্তার অনন্যা এবং অধিনায়ক সাবিনা খাতুনসহ ২১জন নারী ফুটবলার চাকরি করেন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনে (বিজেএমসি)। এর মধ্যে ১১ জন আছেন বাংলাদেশ ফুটবলের ফেডারেশনের আবাসিক ক্যাম্পে। বিজেএমসির বাকি ১০ নারী ফুটবলার বসে আছেন হাত-পা গুটিয়ে। অর্ধযুগ ধরে সিনিয়রদের ঘরোয়া কোনো খেলা নেই। বসে বসেই তাই বেতন গুণতে হচ্ছে বিজেএমসির নারী ফুটবলারদের।

এভাবে আর কত দিন? মেয়েদের স্থায়ী দল থাকা দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিজেএমসিই এখন খেলা না হওয়ায় বিরক্ত। মেয়েদের এভাবে কতদিন বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেবে প্রতিষ্ঠানটি। এমনিতেই প্রতিষ্ঠানটিতে বেতন নিয়ে চলছে আন্দোলন। কর্মচারীরা আন্দলনে সফল হলে নারী ফুটবলারদের বেতনও বেড়ে যাবে; কিন্তু তাদের আসল যে কাজ, সেই খেলাই তো নেই!

মাস তিনেক আগে বিজেএমসি থেকে চিঠি দিয়ে বাফুফেকে খেলা আয়োজনের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল। বাফুফে নাকি এপ্রিলে মেয়েদের ঘরোয়া একটা টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তখন; কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাফুফে সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন শুক্রবার বেরাইদে একাডেমি মাঠে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারা অক্টোবরে মেয়েদের লিগ আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে। একই কথা বলেছেন বাফুফের মহিলা উইংয়ের চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণও।

কিন্তু বাফুফের আশ্বাসে ভরসা পাচ্ছে না বিজেএমসি। বরং মেয়েদের ফুটবলের ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কার কথাই শোনালেন সংস্থাটির ক্রীড়া দপ্তরের এসিও মো. আবদুল কুদ্দুস, ‘কর্তৃপক্ষ আমাদের চাপ দিচ্ছে। আমরা কেনো মেয়ে ফুটবল দল রাখবো? খেলা না থাকলে কোন সংস্থাই মেয়েদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেবে না। জুলাইয়ের মধ্যে মেয়েদের টুর্নামেন্ট না হলে আমরা মেয়েদের ফুটবল দল বন্ধ করে দেবো।’

মাহমুদা আক্তার অনন্যা, সাবিনা খাতুন, কৃষ্ণা রানী সরকার, ইসরাত জাহান রত্না, সিরাত জাহান স্বপ্না, মিসরাত জাহান মৌসুমী, মাসুরা পারভীন, রাজিয়া খাতুন, লাবনী আক্তার, নিলুফা ইয়াসমীন নীলা ও সুলতানা- বিজেএমসির এই ১১ ফুটবলার আছেন বাফুফের ক্যাম্পে।

কিন্তু বিজেএমসির বাকি ১০ ফুটবলার সাবিনা আক্তার (গোলরক্ষক), রওশন আরা, খাদিজা খাতুন রুমা, সুরভী আক্তার ইতি, আছিয়া খাতুন বিথী, সানু আক্তার ঝুমু, সীমা আক্তার খাদিজা, সুরাইয়া, রূপা আক্তার ও রোকশানা আক্তারদের ভবিষ্যত অন্ধকার। চাকরি করা এই মেয়েদের গড়ে মাসিক বেতন হাজার দশেক টাকা। বিজেএমসি ফুটবল দল বন্ধ করে দিলে চাকরিটাই হারাবেন তারা।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) শুক্রবার দিনব্যাপী আয়োজন করেছিল ‘উইমেন্স ফুটবল ডে।’ বাড্ডার বেরাইদে বাফুফের একাডেমি মাঠে দেড়শতাধিক মেয়ে দিনভর মেতেছিলেন ফুটবল নিয়ে। জাতীয় দলের মেয়েদের কাছে পেয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের মধ্যে ছিল খুশির বন্যা। বাফুফে সভাপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন ছিলেন বেজায় খুশি। এমন অনুষ্ঠান নিয়মিত করতে পারলে অভিভাবকরা মেয়েদের ফুটবলে পাঠাবেন- এমন বিশ্বাস বাফুফে সভাপতির।

অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের ফুটবলে পাঠানোয় আগ্রহ বাড়লেই লাভ কি? মেয়েদের খেলার ক্ষেত্রই যে নেই! অর্ধযুগ ধরে মেয়েদের ঘরোয়া ফুটবল নেই বললেই চলে। ২০১১ ও ২০১৩ সালে হয়েছিল দুটি ফুটবল লিগ। ২০১১ সালে হয়েছিল একটি করপোরেট লিগও। মেয়েদের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ সর্বশেষ হয়েছে ২০১৫ সালে। তারপর সিনিয়র মেয়েদের ঘরোয়া কোনো খেলাই নেই।

বাফুফের ক্যাম্পে আছেন ৪৫ জনের মতো নারী ফুটবলার। তাদের সারা বছর ক্যাম্পে রেখে অনুশীলন করাচ্ছে দেশের ফুটবলের অভিভাবক সংস্থাটি। তাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আসছে কিছু সাফল্য। বিশেষ করে এএফসি ও সাফের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলোয় বাংলাদেশ আশানুরূপ ফলও করছে। মেয়েদের ফুটবল নিয়ে তাই চারিদিকে হাততালি।

কিন্তু দেশের মেয়েদের ফুটবলে যেন আলোর নিচে অন্ধকার। নির্দিষ্ট কিছু মেয়েকে সারা বছর ক্যাম্পে রাখার ফল বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে কিছু সাফল্য আসলেও নারী ফুটবলার তৈরির পাইপলাইন নেই বললেই চলে। সরকারের পক্ষ থেকে বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন না করলে ফুটবল খেলার জন্য মেয়েদের খুঁজেই পাওয়া যেত না। কারণ, বাফুফে মেয়েদের ঘরোয়া ফুটবলের কোনো আয়োজনই করছে না।

২০১১ ও ২০১৩ সালে ৮টি করে দল নিয়ে হয়েছিল মেয়েদের ফুটবল লিগ। প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল শেখ জামাল, দ্বিতীয় আসরে আবাহনী। দুই আসরেরই রানার্সআপ মোহামেডান। তখন লিগ খেলে সাবিনা প্রথম বছর শেখ জামাল থেকে পেয়েছিলেন ৬০ হাজার টাকা। দ্বিতীয় আসরে মোহামেডান তাকে দিয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা।

দ্বিতীয় আসরের চ্যাম্পিয়ন আবাহনী কয়েকজনকে ১ লাখ টাকা করেও দিয়েছে। দুই লিগের মাঝে করপোরেট লিগ হয়েছিল। তাতে চ্যাম্পিয়ন বিজেএমসি। ২০১৫ সালে হওয়া জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফিও জিতেছে এই সরকারী প্রতিষ্ঠানটি।

ঘরোয়া টুর্নামেন্ট নিয়মিত হলে আরো মেয়ে ফুটবলার উঠে আসতো। বিজেএমসিও তখন আরো মেয়েদের চাকরি দিতে আগ্রহী হতো। এখন ঘটছে উল্টো ঘটনা- ঘরোয়া খেলা না থাকায় এ সরকারী প্রতিষ্ঠানটি মেয়েদের ফুটবল দল বন্ধ করেই দিতে চলেছে।